রবিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
রবিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ২১শে অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
রবিবার, ৬ই ডিসেম্বর, ২০২০ ইং

শরীয়তপুরের চরাঞ্চল গুলোতে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করছে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপ রাসেল ভাইপার

শরীয়তপুরের চরাঞ্চল গুলোতে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করছে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপ রাসেল ভাইপার

শরীয়তপুরের জাজিরা ও ভেদরগঞ্জ ও সখিপুর সহ বিভিন্ন থানা/উপজেলার চরাঞ্চল গুলোতে ব্যাপক ভাবে বিস্তার লাভ করছে ভয়ঙ্কর বিষাক্ত সাপ রাসেল ভাইপার (চন্দ্রবোড়া সাপ)। এছাড়া পার্শবর্তী জেলা চাঁদপুরের হাইমচরেও রাসেল ভাইপারের দেখা মিলেছে। সর্বশেষ গত ৫ জুলাই ২০২০ সখিপুর থানার কাঁচিকাটা ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা এলাকায় একটি রাসেল ভাইপারকে মেরে ফেলতে সক্ষম হয় স্থানীয়রা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, সচেতনতাই একমাত্র বাঁচার উপায় এ সাপ থেকে। এছাড়া এ সাপের কাঁমড়ের বিপরীতে ভেকসিন পাওয়া কষ্টসাধ্য।

জানাগেছে,
পৃথিবীর সব সাপ মানুষকে এড়িয়ে চলার চেষ্টা করে কিন্তু একমাত্র কিলিংমেশিন খ্যাত রাসেল ভাইপারের সে বৈশিষ্ট্য নেই। বিষধর সাপ হিসেবে পৃথিবীতে রাসেল ভাইপারের অবস্থান ৫ নম্বরে কিন্তু হিংস্রতা আর আক্রমণের দিক থেকে তার অবস্থান প্রথমে। এরা আক্রমণের ক্ষেত্রে এতই ক্ষিপ্র যে, ১ সেকেন্ডের ১৬ ভাগের ১ ভাগ সময়ের ভেতরে কামড়ের সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে পারে।

পৃথিবীতে প্রতিবছর যত মানুষ সাপের কামড়ে মারা যায়, তার উল্লেখযোগ্য একটি অংশ এই রাসেল ভাইপারের কামড়ে মারা যায়। এদের বিষদাঁত বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বৃহৎ। এরা প্রচণ্ড জোরে হিস হিস শব্দ করতে পারে। রাসেল ভাইপারের বিষ হোমটক্সিন, যার কারণে কামড় দিলে মানুষের মাংস পচে যায়।

ভয়ংকর এই রাসেল ভাইপারের বাংলা নাম চন্দ্রবোড়া। তবে রাসেল ভাইপার নামেই বেশি পরিচিত। এর বৈজ্ঞানিক নাম Daboia russelii এরা একেবারে সামনে থেকে মাথা উঁচু করে কামড় বসায়। এদের বিষের এত তিব্রতা যে, খুব কম রোগী বাঁচে। যে স্থানে কামড় দেয়; সে স্থানে পচন শুরু হয়। অনান্য সাপের বেলায় ৪৮ ঘণ্টা কেটে গেলে রোগীকে নিরাপদ ভাবা হয় কিন্তু রাসেল ভাইপারের বেলায় রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফেরার পথে মারা গেছে এমন রেকর্ডও আছে।

রাসেল ভাইপার যে মানুষকে কামড়ায় তাকে বাঁচানো খুবই কষ্টকর। অনেক সময় বিষ নিস্ক্রিয় করা গেলেও দংশিত স্থানে পচন ধরে। তারপর খুব অল্প সময়ের মধ্যেই রোগী মারা যান। পচা অংশ কেটে ফেলার পরেও জীবন বাঁচানো যায় না। দ্রুত পচন ধরে সারা শরীরে। এর অসহিষ্ণু ব্যবহার ও লম্বা বিষদাঁতের জন্য অনেক বেশি লোক দংশিত হন। সাপটির বিষক্রিয়ায় অত্যাধিক রক্তক্ষরণ ঘটে এবং অনেক যন্ত্রণার পর মৃত্য হতে পারে। তবে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ভয়ে হার্ট অ্যাটাকে অনেকের মৃত্যু হয়।

অন্যান্য সাপ শিকারের সময় শিকারকে কামড় দিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেলে কিন্তু হিংস্র রাসেল ভাইপারের শিকারকে শুধু একা নয়, তার পুরো পরিবারসহ খেতে ভালোবাসে। তাই অন্যান্য সাপ যেমন একটি ইঁদুরকে কামড় দিয়ে সাথে সাথে খেয়ে ফেলে, রাসেল ভাইপার সে ক্ষেত্রে কামড় দিয়ে ছেড়ে দেয়। প্রচণ্ড বিষের যন্ত্রণায় ইঁদুর যখন তার গর্তের দিকে ছুটে চলে রাসেল ভাইপার তার পিছু পিছু গিয়ে সে গর্তে ঢুকে সব ইঁদুরকে খেয়ে ফেলে।

এরা দেখতে অনেকটা অজগরের মত। তবে এদের দৈর্ঘ্য সাধারণত ৪ থেকে ৫ ফুট হয়।

ধারণা ছিল, এরা বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মাঝে ২৫ বছর এদের দেখা মেলেনি কিন্তু প্রায় ২৫ বছর পর আবার দেখা মেলে ২০১২ সালে চাপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলে। সে বছর এর বিষে শুধু চাপাইনবাবগঞ্জে মারা যায় ১৫ জন। গবেষকদের ধারণা, ২৫ বছর বিলুপ্ত থাকার পরে বন্যার পানিতে ভেসে ভারত থেকে এই সাপ বাংলাদেশে এসেছে। কারণ পদ্মার তীরবর্তী এলাকায় এ সাপের উপস্থিতি সবচেয়ে বেশি।

২০১৩ সালে আবারো রাজশাহীতে দেখা মেলে সাপটির। এর আক্রমণে সবচেয়ে বেশি মারা যায় কৃষক। সবচেয়ে বেশি আক্রমণ হয়েছে ধানক্ষেতে। তবে সাধারণত ঝোঁপ-ঝাড়, শুকনা গাছের গুড়ি, ডাব গাছের নিচে, গোয়াল ঘরে এ সাপ থাকতে বেশি পছন্দ করে। রাসেল ভাইপার বংশ বিস্তার করে খুব দ্রুত। অন্যান্য সাপ যেখানে ২০ থেকে ৪০টা ডিম দেয়, সেখানে একটি রাসেল ভাইপার ৮০টা পর্যন্ত বাচ্চা দেয়। ফলে দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে রাসেল ভাইপার।

ভেদরগঞ্জ উপজেলার সখিপুর থানার কাঁচিকাটা ইউনিয়নের বাসিন্দা কলেজ ছাত্র রবিন মিয়া বলেন, এ বছর (২০২০) সালের ২৬ মে তারা প্রথম রাসেল ভাইপারের দেখতে পায়। ঐ সময় তারা সাপটিকে মেরে ছবি তুলে রেখেছিল। পরে বিভিন্ন টেলিভিশনের প্রতিবেদন দেখে তারা সাপটি রাসেল ভাইপার হিসেবে নিশ্চিত করে।

তার মতে, এ পর্যন্ত তারা শুধু মাত্র কাঁচিকাটা ইউনিয়নের মাথাভাঙ্গা এলাকাতেই ১০-১৫টির মত রাসেল ভাইপার সাপ দেখেছেন। এর মধ্যে তারা ৫টি সাপ মেরে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন। এছাড়া ঐ এলাকায় রাসেলভাইপারের অনেক বাচ্চা রয়েছে বলেও জানান তিনি।

তিনি বলেন, মাছ শিকার করতে গিয়ে অনেকের খাঁচাতেও ধরা পড়েছিল রাসেল ভাইপার সাপ।

এদিকে কয়েকদিন যাবত জাজিরা উপজেলার পালেরচর সহ বিভিন্ন ইউনিয়নে কয়েকটি রাসেল ভাইপার সাপ ধরাপড়ে। স্থানীয়রা সাপগুলো মেরে সচেতনতার জন্য ফেসবুকে পোষ্ট করে। স্থানীয়দের মতে, পালের চরের জিনু মার্কেট এলাকায় সর্বশেষ এ সাপ ধরা পড়েছিল।।

এছাড়া এ বছর চাঁদপুরের হাইমচর সহ বিভিন্ন এলাকায় রাসেল ভাইপারের উপস্থিতি দেখা মিলেছে বলে জানিয়েছে স্থানীয়রা।

তবে কিছু বিষয়ে সচেতন থাকলে এর থেকে বাঁচা সম্ভব-

১. আশেপাশে পরে থাকা পুরাতন গাছের নিচে খেয়াল না করে হাত দেবেন না।

২. ধান কাটার সময় গামবুট ব্যবহার করবেন।

৩. ধান কাটা শুরুর আগে হাড়ি-পাতিল বা অন্য কিছু দিয়ে প্রচণ্ড শব্দ করবেন, যেন সে ভয়ে পালিয়ে যায়।

৪. যেহেতু এরা খুবই হিংস্র, তাই যেসব এলাকায় বেশি দেখা যায়; সেসব এলাকায় সচেতনভাবে চলাফেরা করা।

৫. এ সাপের উপস্থিতি লক্ষ্য করলে সামনে থেকে সরে যাওয়া। এদের থেকে বাঁচতে হলে সচেতন হতে হবে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য