বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং, ১৮ই অগ্রহায়ণ, ১৪২৭ বঙ্গাব্দ
বৃহস্পতিবার, ৩রা ডিসেম্বর, ২০২০ ইং

বিশ্বসাহিত্যে বঙ্গবন্ধু

সিএনআই নিউজ: ইংরেজ নির্মাতা রিচার্ড অ্যাটেনব্রো ১৯৮২ সালে নির্মাণ করেন ভারতের জাতির জনক মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীকে নিয়ে চলচ্চিত্র ‘গান্ধী’; ২০১২ সালে স্টিভেন স্পিলবার্গের ‘লিংকন’ নামের সিনেমাটি আমেরিকার অন্যতম জনপ্রিয় প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনকে নিয়ে নির্মিত; আততায়ীর হাতে নিহত লিংকনের মৃত্যু নিয়ে ব্যথিত কবি ওয়াল্ট হুইটম্যান লিখেছিলেন অনবদ্য কবিতা ‘ও ক্যাপটেন, মাই ক্যাপটেন’; শব্দশিল্পী থাবিসো মোহারে ২০১৩ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার জাতির পিতা নেলসন ম্যান্ডেলা মারা যাওয়ার পর লেখেন কবিতা ‘অ্যান অর্ডিনারি ম্যান’; আমেরিকার জাতির জনক জর্জ ওয়াশিংটনকে নিয়ে কবি, সমালোচক ও প্রাবন্ধিক জেমস রাসেল লাউয়েল লিখেছিলেন ‘জর্জ ওয়াশিংটন’ নামের কবিতা; মিজ জ্যাকি ওয়েজম্যানের ‘সিং অ্যাবাউট মার্টিন’ শিরোনামের গানটি ‘আই হ্যাভ এ ড্রিম’ খ্যাত ভাষণের নায়ক আফ্রিকান-আমেরিকান মানবাধিকার কর্মী মার্টিন লুথার কিং জুনিয়রকে নিয়ে রচিত। যুগে যুগে এভাবেই বিখ্যাতদের নিয়ে নির্মিত হয়েছে গল্প-কবিতা-নাটক-উপন্যাস-গান ও চলচ্চিত্র। তেমনিভাবে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি, স্বাধীনতার মহান স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে দেশে-বিদেশে লেখা হয়েছে অসংখ্য বই। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে যত লেখা বা গবেষণা হয়েছে, আর কোনো জননেতা বা রাষ্ট্রনায়কের ওপর এতটা হয়নি। বিশেষ করে পঁচাত্তরের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে হত্যার প্রতিবাদে সাধারণ মানুষের মতো দ্রোহে জ্বলে উঠেছিলেন দেশ-বিদেশের বহু কবি, কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক। ফলে রচিত হয়েছে অসংখ্য গল্প-কবিতা-নাটক-গান-প্রবন্ধ-নিবন্ধ।

২.

স্বাধীনতা-পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সময়ে রাজনীতির কবি-পোয়েট অব পলিটিকস-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আবেদন প্রায় সমগ্র বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে স্বদেশের শিল্পী-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি সারা বিশ্বের লেখকরা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশপ্রেম ও অবিস্মরণীয় অবদান নিয়ে রচনা করেন সাড়া জাগানো সব লেখা। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি লেখেন ভারতীয় সাহিত্যিকরা। তাঁরা নানা দৃষ্টিকোণে চিত্রিত করেছেন বঙ্গবন্ধুকে।

ভারতীয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম গৌরী প্রসন্ন মজুমদারের লেখা ‘শোনো একটি মুজিবরের থেকে’ কবিতাটি, যা গান হিসেবে এখনো সমাদৃত। যুদ্ধ চলাকালীন ‘শোনো, একটি মুজিবরের থেকে/লক্ষ মুজিবরের কণ্ঠস্বরের ধ্বনি প্রতিধ্বনি/আকাশে-বাতাসে ওঠে রণি/বাংলাদেশ আমার বাংলাদেশ’ গানটি প্রেরণা জোগাত, আশার সঞ্চার করত মুক্তিকামী বাঙালির হৃদয়ে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারতীয় কবি অমিত বসু বঙ্গবন্ধুর হাতে হাত রেখে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধে শামিল হওয়ার আহ্বান জানান—গঙ্গাতীরে দুঃস্বপ্নের রাত/হঠাৎ বিদ্যুৎ চমকায়/রক্ত আজ সাড়া দেয়/উদ্ভিন্ন যৌবনা পদ্মা/তরঙ্গ পাবন হয়ে ডাকে/চলো যাই/মুজিবের হাতে হাত/বাঙালির বাঁচার লড়াই (চলো যাই/অমিত বসু)।

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ভারতীয় অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক একাত্মতা প্রকাশ করেন বাংলার মুক্তিকামী মানুষের সঙ্গে। তাঁদের লেখনীতে ফুটে ওঠে সে কথাই—

আজ কলমই আমার রাইফেল/মন বারুদ, দৃষ্টি অগ্নিবর্ষী তাই এপার সীমান্তে,/কঙ্গো-কিউবা-ভিয়েতনামের অংশীদার/বঙ্গবন্ধু/জঙ্গী দানবের মুখোমুখি, আমিও তোমার সঙ্গী (এপার সীমান্তে/শান্তিময় মুখোপাধ্যায়)।

অমিয়ধন মুখোপাধ্যায়ও কবিতায় ওড়ান বিজয় পতাকা—বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান/তোমায় শতকোটি প্রণাম/আমি বাঙালী গঙ্গার এপারে/তুমি বাঙালী পদ্মার ওপারে/তাতে কী?/ আমাদের তো একই আত্মা/একই ভাষা বাংলা ভাষা/একই সাথে গাই বাঙলার জয়গান/ওড়াই আকাশে বাঙলার জয়নিশান (রক্ত-তীর্থের গণদেবতা/অমিয়ধন মুখোপাধ্যায়)। বিনোদ বেরা বঙ্গবন্ধুর উদ্দেশে বলেছেন—এ দৃঢ় জ্বলন্ত দেশপ্রেম/প্রাণ তুচ্ছ করা এ যৌবন/নিষ্ফল হবে না মুজিবর,/রাহুমুক্ত হবে বাংলাদেশ (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে/বিনোদ বেরা)।

প্রেমেন্দ্র মিত্র কবিতায় বঙ্গবন্ধু সম্পর্কে লিখেছেন—সে শুধু বাড়ায় যেই হাত,/শুদ্ধ এক ভাবীকাল অমল প্রীতির/এ পঙ্কিল সময়েরও স্রোত ঠেলে, যেন/মেলে ধরে আরেক প্রভাত।/নানা পরিচয়ে আসে,/কত যুগ কত দেশ ভিন্ন নামে তবু/শোনে তার একই কণ্ঠস্বর।/আজ আমাদেরই মাঝে মুগ্ধ মন জানে/নাম তার বন্ধু মুজিবুর! (বন্ধু/প্রেমেন্দ্র মিত্র)। কবি বলাই চাঁদ মুখোপাধ্যায় বঙ্গবন্ধুকে স্মরণ করেছেন এই প্রত্যয় দীপ্ত শব্দগুচ্ছে—আমার তোমার নয়, চাও তুমি বাংলার জয়/তারই লাগি মৃত্যুমুখে আগাইয়া গিয়াছ নির্ভয়,/তোমার বিরাট সত্তা আজি তাই হিমাদ্রি-সমান/বাঙালির সর্ব গর্ব তোমাতেই আজি দ্যুতিমান।/আমি বাংলার কবি তাই বন্ধু ছুটিয়া এলাম/মুজিবর রহমান লহ মোর সহস্র সেলাম (সহস্র সেলাম/বনফুল)।

শত দুঃখ-দুর্দশার মাঝেও বঙ্গবন্ধু প্রজ্বলিত করেন আশার আলো। কবি বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেন সে কথাই—মুজিবর! শেখ মুজিবর!/তোমাকে সেলাম, তুমি কান্নার/নদীকেও সাজালে রূপসী/বাংলার এই রূপ, এত রূপ/যত চোখ মেলে দেখি, তত বুক ভরে/আর ভালোবাসি, তত ভালোবাসি (বাংলার এই রূপ/বীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়)।

পশ্চিমবঙ্গের খ্যাতিমান কবি ও কথাসাহিত্যিক সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় লেখেন, ‘রাসেল অমবাধ শিশু তোর জন্য আমিও কেঁদেছি/খোকা, তোর মরহুম পিতার নামে/যারা একদিন তুলেছিল আকাশ ফাটানো জয়ধ্বনি/তারাই দু’দিন বাদে থুতু দেয়, আগুন ছড়ায়/আমি ক্ষমা চাই, আমি সভ্যতার কাছে ক্ষমা চাই।’ কবিতাটিতে রাসেল ও বঙ্গবন্ধুর মুখচ্ছবি ফুটে ওঠে। গান্ধীকে নিয়ে কবি অরুণ মিত্র একটি কবিতা লিখেছিলেন, ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে আছে কাল, একশো গান্ধী যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’ বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর এই পঙক্তিটিই গান্ধীর স্থলে মুজিব বসিয়ে শঙ্খ ঘোষ বলেছেন, ‘আজকের দিন যদি ব্যর্থ হয় তাহলে আছে কাল, ‘একশ মুজিব যদি মিথ্যে হয় তবুও থাকে সত্য।’ আর কবি অন্নদাশঙ্কর রায় তাঁর কাব্যে বঙ্গবন্ধুকে করে রাখলেন চিরস্মরণীয়—যত কাল রবে পদ্মা যমুনা/গৌরী মেঘনা বহমান/ততকাল রবে কীর্তি তোমার/শেখ মুজিবুর রহমান/দিকে দিকে আজ অশ্রুগঙ্গা/রক্তগঙ্গা বহমান/নাই নাই ভয় হবে হবে জয়/জয় মুজিবুর রহমান (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্মরণে/অন্নদাশঙ্কর রায়)।

উল্লিখিত ভারতীয় কবিরা ছাড়াও পশ্চিমবঙ্গের আরো অসংখ্য কবি-সাহিত্যিক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন। তাঁদের মধ্যে পশ্চিম বাংলার বুদ্ধদেব বসু, নচিকেতা ভরদ্বাজ, নিশিকান্ত মজুমদার, আবদুস সামাদ, বীরেন্দ্রকুমার গুপ্ত, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, শক্তি চট্টোপাধ্যায়, রাজলক্ষ্মী দেবী, অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্ত, বিমল চন্দ্র ঘোষ, দীনেশ দাস, মনীন্দ্র রায়, গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়, মৃণাল কান্তি কালী, নন্দেশ্বর সিংহ, এলাংবম নীলকান্ত করুণারঞ্জন ভট্টাচার্য, বীরেন্দ্রকুমার গুপ্ত, নলিনীকান্ত গঙ্গোপাধ্যায়, বিভূতি ভট্টাচার্য, তারক ঘোষ, অলক কুমার চৌধুরী, শৈলেশচন্দ  ভট্টাচার্য, সত্যেশ্বর মুখোপাধ্যায়, জগদ্বীশ চন্দ্র চক্রবর্তী, নির্মল আচার্য, মকবুল হোসেন, শান্তিকুমার ঘোষ, গোলাম রসুল, অমিতাভ দাশগুপ্ত, তরুণ সান্যাল, দেবেশ রায়, গৌরী ঘটক, রাম বসু, তারাপদ রায়, অমিতাভ চৌধুরী অন্যতম।

৪.

ভারতীয় কবি-সাহিত্যিকদের পাশাপাশি পকিস্তানের প্রগতিশীল কবি-সাহিত্যিকরাও একাত্তরের গণহত্যার নিন্দা ও প্রতিবাদ করেছেন সে সময়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে লিখেছেন কবিতাও। এ রকমই একজন মানবপ্রেমী কবি আহমেদ সালিম। ২০১৭ সালের ২৬ জুলাই শহীদ জননী জাহানারা ইমাম স্মরণ অনুষ্ঠানে এসে পাকিস্তানের কবি আহমেদ সালিম বক্তৃতা দেন। সে অনুষ্ঠানে তিনি জানান, পাঞ্জাবি ভাষায় তিনি ‘বাংলাদেশ দীর্ঘজীবী’ হোক এবং ‘সোনার বাংলা’ শিরোনামে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে কবিতা লেখেন। সেই অপরাধে তাঁকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং দীর্ঘ ছয় মাস পর ১৯৭২ সালের জানুয়ারি মাসে তিনি মুক্তি পান। আরেক উর্দুভাষী কবি সৈয়দ আসিফ শাহকার। জন্মসূত্রে পাকিস্তানি। এখন সুইডেনের নাগরিক এবং সে দেশের একজন বিচারপতিও তিনি। মুক্তিযুদ্ধের সময় তাঁর বয়স ছিল ২২ এবং তখন তিনি পাঞ্জাব স্টুডেন্ট ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। বাংলাদেশে গণহত্যা বন্ধে তিনি ও তাঁর সহযোগীরা প্রতিবাদী লিফলেট বিলি করতেন।

৫.

ভারত এবং পাকিস্তান ছাড়াও অন্যান্য দেশের সাহিত্যিকদের মধ্যে জাপানি কবি মুত্সু শুকুয়া আশা পোষণ করেন, বঙ্গবন্ধুর চেতনাকে ধারণ করে ক্ষুধামুক্ত সোনার বাংলাদেশ বিনির্মাণে এগিয়ে যাবে নতুন প্রজন্ম। ‘বাংলাদেশের মহান পিতা’ শীর্ষক কবিতায় তিনি বলেন, আমি আশা রাখছি/তোমার আদর্শকে লালন করে/এগিয়ে যাবে শান্তিপ্রিয় মানুষ,/তুমি তো জানো/পৃথিবীর প্রায় প্রতিটি মানুষই ক্ষুধার্ত। (অনুবাদ : আলমগীর রেজা চৌধুরী)

মার্কিন কবি লোরি অ্যান ওয়ালশ ‘কামিং অব এইজ’ পত্রিকার ১৯৯৪ সালের ১৭ মার্চ সংখ্যায় ‘বঙ্গবন্ধু’ শিরোনামে তাঁর কবিতায় বলেন—মৃত্যু বাঙালিকে জয় করতে পারেনি/বাঙালি মৃত্যুকে জয় করেছে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১/বঙ্গবন্ধু বাংলার বুক উঁচু করে, চোখের জল মোছে/‘আর বাঙালি নির্যাতিত হবে না, আর বাঙালি মরবে না;/মাকে দেয়া প্রতিশ্রুতি বঙ্গবন্ধু পালন করে।/স্বাধীন বাংলাদেশের জন্ম হয়, জন্ম হয় একটি উজ্জ্বল আগামীর প্রত্যাশা (অনুবাদ : টিপু ভাট্রা)।

মার্কিন সাহিত্যিক রবার্ট পেইন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ১৯৭৭ সালে লেখেন তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস ‘দ্য টর্চার্ড অ্যান্ড দ্য ডেমড’। এ ছাড়া সালমান রুশদির ‘মিডনাইটস্ চিলড্রেন’ এবং ‘শেইম’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের উপন্যাস ‘পূর্ব-পশ্চিম’, জাপানি গবেষক ড. কাজুও আজুমা, প্রফেসর নারা, বসনিয়ার কবি ইভিকাপিচেস্কি, ব্রিটিশ কবি টেড হিউজের লেখায় বঙ্গবন্ধু উপস্থাপিত হয়েছেন নানাভাবে।

মন্তব্য করুন

মন্তব্য